শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ০২:৪৮ অপরাহ্ন
২৭ রানে ধস, টেস্ট ইতিহাসে ক্যারিবীয়দের চরম লজ্জা
অনলাইন ডেস্ক
ক্রিকেট ইতিহাসে এমন বিভীষিকাময় দিন খুব কমই দেখা গেছে। কিংস্টনের সবুজ উইকেটে অস্ট্রেলিয়ার মুখোমুখি হয়ে মাত্র ২৭ রানে ধসে পড়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ, যা টেস্ট ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দলীয় ইনিংস। স্টার্কের ১৫ বলের দুর্ধর্ষ পাঁচ উইকেট আর বোল্যান্ডের হ্যাটট্রিক যেন রচিত করল ভয়ংকর এক রূপকথা। ব্যাটারদের জন্য দুঃস্বপ্ন, আর বোলারদের জন্য যেন স্বর্গীয় এক উপাখ্যান—এই ম্যাচ বহুদিন মনে রাখবে বিশ্ব ক্রিকেট।
২৭ রানে ধস—ওয়েস্ট ইন্ডিজের লজ্জার রেকর্ড
মাত্র ২৭ রানে গুটিয়ে যাওয়া ওয়েস্ট ইন্ডিজের ইনিংসটি টেস্ট ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দলীয় স্কোর। একমাত্র ১৯৫৫ সালে নিউজিল্যান্ডের ২৬ রানের ইনিংস রয়েছে এর নিচে। ওয়েস্ট ইন্ডিজেরও এটি নিজেদের ইতিহাসের লজ্জাজনকতম স্কোর, আগেরটি ছিল ২০০৪ সালে একই মাঠে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে করা ৪৭ রান।
দুই ইনিংসে মাত্র ১৭০—যৌথভাবে সর্বনিম্ন স্কোর
ওয়েস্ট ইন্ডিজের দুই ইনিংস মিলিয়ে রান হয়েছে মাত্র ১৭০, যা কোনো পূর্ণাঙ্গ টেস্টে তাদের যৌথভাবে সর্বনিম্ন সম্মিলিত স্কোর। পূর্বের সর্বনিম্ন ছিল ১৭৫ রান, ১৯৫৭ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে।
মাত্র ১৪.৩ ওভারেই শেষ ইনিংস—তৃতীয় দ্রুততম পতন
ওয়েস্ট ইন্ডিজের দ্বিতীয় ইনিংস শেষ হতে সময় লেগেছে মাত্র ১৪.৩ ওভার, যা টেস্ট ইতিহাসে তৃতীয় দ্রুততম অলআউট ইনিংস। এর চেয়ে দ্রুততর ছিল দক্ষিণ আফ্রিকা (১৯২৪ সালে, ১২.৩ ওভার, ৩০ রান) ও শ্রীলঙ্কা (২০২৪ সালে, ১৩.৫ ওভার, ৩২ রান)।
৭টি ডাক—এক ইনিংসে রেকর্ড শূন্য
এই ইনিংসে ৭ ব্যাটারই শূন্য রানে ফিরেছেন প্যাভিলিয়নে। টেস্ট ইতিহাসে এটাই প্রথমবার ঘটল। পূর্বে সর্বোচ্চ ছিল ৬টি ডাক, যা ঘটেছিল ৯ বার—সর্বশেষ এ মাসেই এজবাস্টনে।
১৫ বলে ফাইভ-ফর—স্টার্কের বিধ্বংসী জাদু
মাত্র ১৫ বলেই মিচেল স্টার্ক তুলে নেন পাঁচ উইকেট—পুরুষদের টেস্ট ইতিহাসে এটি দ্রুততম ফাইভ-ফর। আগের রেকর্ড ছিল ১৯ বল, যা ছিল ব্রড (২০১৫), বোল্যান্ড (২০২১) এবং তোশাকের (১৯৪৭) দখলে।
হ্যাটট্রিক করলেন বোল্যান্ড—১৩ বছর পর অজি হ্যাটট্রিক
স্কট বোল্যান্ড তার টেস্ট ক্যারিয়ারে প্রথম হ্যাটট্রিক করে অস্ট্রেলিয়াকে দিলেন আরও একটি গৌরবময় মুহূর্ত। এটি অস্ট্রেলিয়ার ১০ম টেস্ট হ্যাটট্রিক, সবশেষ হয়েছিল ২০১০ সালে পিটার সিডলের হাত ধরে। ইংল্যান্ডের (১৫টি) পরে এখন দ্বিতীয়।
১০০তম টেস্টে স্টার্কের সেরা বোলিং
স্টার্ক এই ম্যাচে ইনিংসে ৬/৯ ফিগার নিয়ে গড়েছেন নতুন রেকর্ড—১০০তম টেস্টে খেলা কোনো ক্রিকেটারের সেরা বোলিং পারফরম্যান্স। আগের রেকর্ডটি ছিল মুরালিধরনের ৬/৫৪, বাংলাদেশের বিপক্ষে।
৪০০ উইকেটের মাইলফলক—স্টার্ক দ্বিতীয় দ্রুততম (বলসংখ্যায়)
এই ম্যাচেই স্টার্ক টেস্টে ৪০০ উইকেট পূর্ণ করেন। তার লেগেছে ১৯,০৬২ বল, যা বলসংখ্যার হিসেবে দ্বিতীয় দ্রুততম। শুধু ডেল স্টেইন (১৬,৬৩৪ বল) ছিলেন তার আগে।
শীর্ষ ছয়ের সম্মিলিত রান মাত্র ৬—ব্যাটিং ব্যর্থতার চূড়ান্ত রূপ
ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম ছয় ব্যাটার মিলিয়ে করেছেন মাত্র ৬ রান, যা টেস্ট ইতিহাসে কোনো দলের টপ সিক্স ব্যাটারের সর্বনিম্ন সম্মিলিত রান। পূর্বের রেকর্ড ছিল ১২ রান (অস্ট্রেলিয়া বনাম ইংল্যান্ড, ১৮৮৮)।
কোনো ফিফটি ছাড়াই ম্যাচ শেষ—মাত্র ১৬ বার ঘটেছে এমন
এই ম্যাচে কেউই ফিফটি ছুঁতে পারেননি। সর্বোচ্চ স্কোর ছিল স্টিভ স্মিথের ৪৮। টেস্ট ইতিহাসে এ পর্যন্ত মাত্র ১৬ বার এমন ঘটনা ঘটেছে, যেখানে ম্যাচে কেউ ফিফটি করেননি।
ম্যাচে মোট রান ৫১৬, বল ১০৪৫—সর্বনিম্নদের তালিকায় জায়গা
এই ম্যাচে দুই দল মিলে রান হয়েছে ৫১৬, যা টেস্ট ইতিহাসে সপ্তম সর্বনিম্ন সম্মিলিত স্কোর। আর ম্যাচটি শেষ হয়েছে মাত্র ১০৪৫ বলে—১৯১০ সালের পর এত কম বল খেলে চার ইনিংসের টেস্ট শেষ হয়নি।
প্রথম ওভারেই ধস—স্টার্কের হাতে তিন উইকেট
স্টার্ক নিজের প্রথম ওভারেই তিনটি উইকেট তুলে নিয়ে শুরুতেই ভেঙে দেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের মেরুদণ্ড। ২০০৬ সালের পর প্রথমবার টেস্টে প্রথম ওভারেই এমন ধস নামল। মজার ব্যাপার, ২০১৫ সালে এই একই মাঠেই স্টার্ক প্রথম ওভারে দুটি উইকেট নিয়েছিলেন।
ক্রিকেট ইতিহাসে এমন এক ভয়াবহ টেস্ট খুব কমই দেখা গেছে। রেকর্ড ভাঙা, ভয় ধরানো বোলিং স্পেল, লজ্জাজনক ব্যাটিং ব্যর্থতা আর নজিরবিহীন ধস—সব মিলিয়ে কিংস্টনের এই ম্যাচ টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে লেখা থাকবে এক অভূতপূর্ব অধ্যায় হিসেবে।